বিষয়ঃ অধ্যায় ২২ - নজরে পড়ে যাওয়া

ইংল্যান্ডের সাহিত্যিক মহারথি কর্মী উপস্থিত 2790শব্দ 2026-03-04 18:29:13

বাকিংহাম প্রাসাদ,
সুন্দর ও মহিমান্বিত।
ভিক্টোরিয়া রানি সিংহাসনে আরোহণের পর, এখানেই রাজপ্রাসাদের আনুষ্ঠানিক মর্যাদা লাভ করে, এবং তারপর থেকে এটি ব্রিটিশ রাজপরিবারের বাসস্থান হিসেবে আজও টিকে আছে।
বিদেশি অতিথি এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে রানী এখানেই সবাইকে আমন্ত্রণ জানান ও আপ্যায়ন করেন।
স্টিফেনসন লু শিকে নিয়ে প্রাসাদের সামনের চত্বরে প্রবেশ করলেন,
ঘাসের ওপরে বিজয় দেবীর সোনালী মূর্তি নীরবে তাঁদের দিকে তাকিয়ে রইল।
স্টিফেনসন বললেন, ‘‘লু সাহেব, আপনি রাজদরবারে প্রবেশের নিয়ম জানেন না, তাতে অসুবিধা নেই, তবে দয়া করে চিং সরকারে প্রচলিত হাঁটু গেড়ে প্রণাম করার রীতি অনুসরণ করবেন না। আপনি শুধু দুটো কথা মনে রাখবেন—যা দেখা উচিত নয়, তা দেখবেন না; যা বলা উচিত নয়, তা বলবেন না।’’
লু শি মাথা নাড়লেন,
‘‘স্যার, আমার একটি প্রশ্ন আছে। রানী আমার সম্পর্কে জানলেন কীভাবে? ‘কেউ রইল না’ উপন্যাসের জন্য?’’
তিনি এই প্রশ্নটি নিয়ে অনেকক্ষণ ভেবেছেন, তবুও মনে হয়েছে কিছু একটা ঠিক মেলেনি,
যদি রানী ‘কেউ রইল না’-র ব্যাপারে জানতে চাইতেন, তবে কুপার ও স্কট নিশ্চয়ই আগেই তাঁকে সতর্ক করতেন।
স্টিফেনসনের ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল, বললেন, ‘‘এ প্রশ্নের জবাব আমার পক্ষে দেওয়া কঠিন, তবে আমি নিশ্চয়তা দিচ্ছি, রানীর আপনার প্রতি কোনো বিরূপ মনোভাব নেই।’’
এভাবে কথা বলতে বলতে তাঁরা এক পাশের দরজার কাছে পৌঁছে গেলেন।
স্টিফেনসন দরজাটি ঠেলে খুললেন,
রোদের আলো ঘরের ভেতর ছড়িয়ে পড়ল।
এটি ছিল সম্ভবত একটি গ্রন্থাগার, চারপাশের দেয়ালজোড়া উঁচু বুকশেলফে বইぎ詰詰 ভাবে সাজানো,
ছাপার কালি ও কাগজের তাজা সুবাস বাতাসে ভেসে এলো।
ঘরের মাঝখানে এক সুদৃশ্য লম্বা মেজের ওপারে এক বৃদ্ধা বসে আছেন, তিনিই ভিক্টোরিয়া রানি, হ্যানোভার রাজবংশের শেষ সম্রাট ও ভারতের সাম্রাজ্ঞী, জীবন্ত এক কিংবদন্তি।
রানী মুখ তুলে চোখ কুঁচকিয়ে আগন্তুকের দিকে তাকালেন,
‘‘তুমি-ই কি লু সাহেব?’’
লু শি ধীর পায়ে এগিয়ে এসে ডান হাত বুকে রেখে, শরীর খানিকটা সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে মাথা নাড়লেন, বললেন, ‘‘মহারানী।’’
স্টিফেনসন খানিক বিস্মিত হলেন,
তিনি ভাবেননি, লু শির জেন্টলম্যানের অভিবাদন এত নিখুঁত হবে।
রানীর মুখে কোমল হাসি ফুটল,
‘‘ফ্রেক, দাঁড়িয়ে আছো কেন, আমাদের অতিথির জন্য একটি আরামদায়ক হাতলওয়ালা চেয়ার এনে দাও।’’
স্টিফেনসনের পুরো নাম ফ্রেডেরিক, ডাক নাম ফ্রেক,
আগে রানী বাইরের লোকের সামনে কখনও এভাবে অপ্রাতিষ্ঠানিক নামে ডাকতেন না, তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ অভ্যাস বেড়েছে,
প্রতিবার এ ডাক শোনার পর স্টিফেনসনের নাক ভারী হয়ে আসে,
রানী বুড়িয়ে গেছেন।
মানুষকে তো আর ধরে রাখা যায় না, রাঙামুখ আয়নাকে বিদায় দেয়, ফুল গাছ ছেড়ে যায়,
সবাই বলে, রূপবতীর বার্ধক্য ও বীরের পতনই পৃথিবীর সবচেয়ে দুঃখজনক ঘটনা, আর রানী যেন এই দুইয়েরই সংমিশ্রণ,

তিনি রূপবতী, একই সঙ্গে ইংল্যান্ডের বীরও।
স্টিফেনসন লু শির জন্য চেয়ার এগিয়ে দিলেন, তারপর পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন।
লু শি গম্ভীর হয়ে বসলেন।
রানী বললেন, ‘‘লু সাহেব, অপ্রয়োজনীয় চিন্তা করবেন না। আমি আপনাকে ডেকেছি, কেবল একটু আলাপ করার জন্য, যেমন আপনার উপন্যাস নিয়ে, কিংবা আপনি আমেরিকা সম্পর্কে কী ভাবেন তা নিয়ে।’’
লু শি খানিক চমকে গেলেন, কিছু বলার সাহস পেলেন না।
চীনে হলে সম্রাট নিজে প্রশ্ন করলে, সেটাই তো রাজসভায় সর্বোচ্চ পরীক্ষা।
রানী লু শির সংকোচ দেখে আবার বললেন, ‘‘লু সাহেব মনে হচ্ছে আমেরিকা এখন উঠে আসছে বলে মনে করেন।’’
আসলে ‘‘মনে হচ্ছে’’ বলার কিছু নেই,
আমেরিকা তো সত্যিই উঠে আসছে, এ কথা ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ ও পণ্ডিত—সবাই মানেন।
লু শি ভেবে বললেন, ‘‘মহারানী, আপাতত ইংল্যান্ডই পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ।’’
রানী হেসে ফেললেন,
‘‘আপনি বললেন, ‘আপাতত’—শব্দটি খুব সাবধানে ব্যবহার করেছেন। আপনাকে ধন্যবাদ, পূর্বদেশের ছাত্র, আপনি মনোরঞ্জনের জন্য মধুর কথা বলেননি, আমাকে প্রতারণাও করেননি, আপনি যথেষ্ট সৎ।’’
এমন প্রশংসায় লু শি খানিকটা অস্বস্তি বোধ করলেন,
বাস্তবে তিনি একেবারেই সৎ নন।
তিনি বললেন, ‘‘মহারানী, আপনার শাসনে দেশকে ভালোবাসে সবাই, আপনাকেও শ্রদ্ধা করে। আজ যখন আমি ঘোড়ার গাড়িতে এখানে এলাম, লন্ডনের বাসিন্দারা রানীর রক্ষীবাহিনীর লাল পোশাক দেখেই রাস্তা ছেড়ে দিলেন।’’
রানীও প্রশংসা পেয়ে ভালোই লাগল,
তবুও তিনি সংযতভাবে বললেন, ‘‘ওটা শ্রদ্ধা নয়, ওটা ভয়, আইনভয়ের ফল।’’
বাস্তবেই এমন আইন আছে,
রানীর রক্ষীবাহিনী দেশের সর্বোচ্চ নেত্রীর নিরাপত্তার দায়িত্বে সদা প্রস্তুত, তাঁদের পথের সামনে দাঁড়ানো, উল্টো চলা বা বাধা দেওয়া আইনবিরুদ্ধ, তাঁদের সৈন্যরা অনুমতি ছাড়াই জরুরি ব্যবস্থা নিতে পারে।
অর্থাৎ, তাঁরা সত্যিই গুলি করতে পারে,
ঠিক আমেরিকার মতই।
লু শি মাথা নেড়ে বললেন, ‘‘মহারানী, আমি কোনো প্রশংসা করতে চাইনি। আপনার প্রভাব অসাধারণ, বিশ্বের অনেক বিখ্যাত স্থান আপনার নামে, আফ্রিকার সবচেয়ে বড় হ্রদ ভিক্টোরিয়া হ্রদ, অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া অঙ্গরাজ্য, কানাডার ভিক্টোরিয়া নগর, আর সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে থাকা ভিক্টোরিয়া পার্ক...’’
রানীর চোখদুটি উজ্জ্বল হয়ে উঠল, যেন পঞ্চাশ বছর আগেকার তারুণ্য ফিরে পেলেন।
তিনি স্টিফেনসনের দিকে তাকিয়ে বললেন,
‘‘ফ্রেক, সত্যি তো? আমি তো মনে করতে পারছি না, কানাডা... উঁহু... ওটা কি ব্রাজিল নয়?’’
স্টিফেনসনের মুখ লাল হয়ে গেল,
‘‘মহারানী, আমি... আমি এখনই খোঁজ নিয়ে জানাই।’’
বলেই দ্রুত বেরিয়ে গেলেন।
শিগগিরই তিনি ঘরে ফিরে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, ‘‘মহারানী, লু সাহেবের কথা একেবারে ঠিক। আর আপনি ভুলও করেননি, ব্রাজিলেও ভিক্টোরিয়া আছে, কানাডাতেও।’’
রানী হালকা স্বরে বললেন, আবার লু শির দিকে ফিরলেন,
‘‘লু সাহেব, আপনি অত্যন্ত জ্ঞানী ও অভিজ্ঞ, তাই আমেরিকা সম্পর্কে আপনার এমন সিদ্ধান্তে অবাক হবার কিছু নেই।’’

আবারও আলোচনাটি সেই প্রসঙ্গে ফিরে এলো।
রানীর শাসনকাল ছিল ইংল্যান্ডের সবচেয়ে শক্তিশালী ‘‘সূর্য না ডোবা সাম্রাজ্য’’র যুগ, ইতিহাসে যাকে ‘‘ভিক্টোরিয়ান যুগ’’ বলা হয়,
এই সময়ে ব্রিটেন উপনিবেশ স্থাপনে গতি বাড়ায়, মুক্ত বাজার অর্থনীতি শীর্ষে পৌঁছায়, তারপর একচেটিয়া পুঁজিবাদে রূপ নেয়, রাষ্ট্রব্যবস্থা, অর্থনীতি ও সংস্কৃতিতে অভূতপূর্ব সাফল্য আসে, সাংবিধানিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা লাভ করে,
ভিক্টোরিয়া নিজেও ব্রিটেনের সমৃদ্ধির প্রতীক হয়ে ওঠেন।
তবে এই শিখর বেশিদিন স্থায়ী হয়নি,
রানীর মৃত্যুর পর, আমেরিকা অবিশ্বাস্য গতিতে উঠে আসে।
আর রানীর মৃত্যুর দিনটি ১৯০১ সালের ২২ জানুয়ারি, অর্থাৎ এখন থেকে তিন মাসও বাকি নেই।
লু শি বললেন, ‘‘মহারানী, আমি তো সবে বিদেশে পড়তে এসেছি, দুনিয়া দেখতে শুরু করেছি, আপনার এত প্রশংসা আমার একেবারেই প্রাপ্য নয়।’’
এ কথা বিনয় নয়, লু শি নিজের সামর্থ্য সম্পর্কে পরিষ্কার।
রানী তাঁর আপত্তিতে বিরক্ত হলেন না,
একটু চুপ করে থেকে বললেন, ‘‘আসলে ইচ্ছে ছিল আপনাকে রাজপরিবারের জন্য কাজ করতে বলি, প্রিন্সেসকে ইংরেজি রচনা শেখানোর জন্য। এখন মনে হচ্ছে সে সুযোগ আর নেই।’’
প্রিন্সেস...
তাঁর নাম মার্গারিটা?
একটি মেয়ের ছায়া লু শির মনে ভেসে উঠল, তিনি বুঝতে পারলেন রানী কেন তাঁর কথা জানেন।
তিনি তাড়াতাড়ি বললেন, ‘‘মহারানী, নিয়ম অনুযায়ী প্রিন্সেসের শিক্ষা সাধারণত কোনো অভিজাত ব্যক্তি দেন, আমি একজন বিদেশি, আমার কোনো যোগ্যতা নেই। তার ওপর ইংরেজি শেখানো, আমি তা পারি না। আর ধরে নিলাম অভিজাত শিক্ষার নিয়ম মানা না-ও হলো, লন্ডনে তো অসংখ্য বিশ্ববিদ্যালয় আছে, শীর্ষস্থানীয় পণ্ডিতেরও অভাব নেই, তাহলে প্রাইভেট টিউটর নিয়োগের প্রথা অনুসরণ করার কী দরকার?’’
রানী শুনেছেন প্যারিসের বিশ্ববিদ্যালয়ও নারীদের ভর্তি করছে,
তিনি ভ্রূ কুঁচকালেন,
‘‘প্রিন্সেসকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠাবো? লু সাহেব তো আরও এক ধাপ এগিয়ে গেলেন।’’
আসলে এও খুব অভিনব নয়,
ইতিহাস অনুযায়ী, ব্রিটিশ রাজপরিবারের শিক্ষাব্যবস্থা অচিরেই সংস্কার হবে, প্রিন্সেসও প্রিন্সদের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাবেন।
রানী মাথা নিচু করে চিন্তায় ডুবে গেলেন, হয়তো বিষয়টির সম্ভাব্যতা ভাবছিলেন।
সময় নিঃশব্দে কেটে গেল,
ঘরে নিস্তব্ধতা, শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দে মনে হতে লাগল, রানী বুঝি ঘুমিয়ে পড়েছেন।
কতক্ষণ কেটে গেল কে জানে,
‘‘লু সাহেব, আজ আপনার আগমনে আমি কৃতজ্ঞ।’’
অবশেষে রানী অতিথি বিদায়ের সময় জানালেন।
লু শি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন, বিদায় জানাতে যাবেন এমন সময় রানী আবার বললেন, ‘‘শুনেছি আপনি ‘ডেইলি টেলিগ্রাফ’ ও ‘ম্যানচেস্টার গার্ডিয়ান’-এ সম্পাদকীয় লিখবেন, আমি অপেক্ষায় থাকব।’’

এই একটি বাক্যেই লু শির সদ্য হালকা হওয়া মন আবার ভারী হয়ে উঠল।
রানীর নজরে কেন পড়ে গেলাম?