অধ্যায় তিপ্পান্ন: জি চাং, তোমার এখানে আসা উচিত হয়নি (দ্বিতীয় অংশ)
আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম, এখনও কালো পোশাকপরা যুবকের প্রশ্নের উত্তর দেবার সুযোগ পাইনি, ওর দেহ হঠাৎ কেঁপে উঠল, শরীর ঘামে ভিজে গিয়েছে, মুখ ফ্যাকাশে, তারপরই সে অজ্ঞান হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।
এ কী হল! আমি সাথে সাথে হতবুদ্ধি হয়ে পড়লাম, বুঝতে পারছিলাম না এখন কী করা উচিত।
কালো পোশাকের যুবকের এই অস্বাভাবিক আচরণ সঙ্গে সঙ্গে ছোট শহরের অন্যদের দৃষ্টি আকর্ষণ করল। দ্রুতই কয়েকজন ছুটে এল। বছর বেশি এমন একজন অভিজ্ঞ বয়স্ক লোক, ধীরে ধীরে হাঁটু গেড়ে যুবকের অবস্থা পরীক্ষা করতে লাগলেন। আর কয়েকজন যুবক বিরূপ দৃষ্টিতে আমাকে আর ইউয়ান লিংকে দেখে, এমন ভঙ্গিতে এগিয়ে এলো যেন এখনই আমাদের মারতে আসবে।
এ কী অবস্থা! আমি তো কিছুই করিনি! ও হঠাৎ পড়ে গেল, এতে আমার কী দোষ! ওর নিশ্চয়ই কোনো গোপন অসুখ আছে, হঠাৎ発病 করেছে। তোমরা এমন শত্রুর মতো আমার দিকে তাকাবে না।
আমি ভিতরে ভিতরে ভীষণ দুশ্চিন্তায় ছিলাম, তবু নিজেকে সামলে রেখে বললাম, ‘‘আমি কিছুই করিনি, ওর কী যে হয়ে গেল জানি না।’’
কিন্তু কথা বলার সাথে সাথেই মনে পড়ল, আমার কাঁধে থাকা সেই চিহ্নটার সঙ্গে ওর একটা অদ্ভুত যোগ আছে, একটু আগে আমার চিহ্নে হঠাৎ একটা জ্বালা অনুভব হয়েছিল, তারপরই সে পড়ে গেল, তবে কি সবকিছুই এই চিহ্নের জন্য?
তরুণরা স্পষ্টই আমার কথায় বিশ্বাস করল না। ওরা ধীরে ধীরে আমাদের ঘিরে ফেলল। ভাগ্যিস, তখনই চুলে পাক ধরা সেই বৃদ্ধ লোকটি উঠে দাঁড়ালেন, ‘‘কোথাও কোনো আঘাত নেই, কোনো অস্বাভাবিকতাও নেই, মনে হয় না কেউ ওকে আক্রমণ করেছে।’’
আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম, কিন্তু আবার উত্তেজনায় ঘেমে উঠলাম, কারণ বৃদ্ধ লোকটি আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন, ‘‘তোমরা কারা? হুয়াংজিয়ালিং-এ কেন এসেছো? আমরা বাইরের লোকদের এখানে দেখতে চাই না।’’
আমার উত্তর দেবার আগেই, মাটিতে পড়ে থাকা যুবক দীর্ঘশ্বাস ফেলে গালাগালি করতে করতে উঠল, ‘‘ধুর! ভয়ানক ব্যথা লাগল। আসলে কী হয়েছিল?’’ তারপর সরাসরি আমার সামনে এসে দাঁড়াল, ‘‘ঠিক কী হয়েছিল? আমি ঢুকতেই তোমার শরীর থেকে একটা অদ্ভুত গরম স্রোত আমার দিকে ছুটে এলো, যেন আমার পুরো শরীরটা আগুনে পুড়ছে, হাড়গোড় পর্যন্ত ব্যথা করছিল। তুমি বলো, তুমি কিছু জানো না?’’
‘‘হয়তো এটার জন্য হবে।’’ আমি আমার বাঁ হাত বাড়িয়ে সেই চিহ্নটা দেখালাম, ‘‘এই চিহ্নটা আমার হাতে এক নারীমৃতদেহের অপবিত্র আচার-অনুষ্ঠানের সময় পড়েছে। আমি এখানে এসেছি যাতে এই অশুভ চিহ্নটা সরাতে পারি, নাহলে আমি মরে যাব।’’
‘‘বিস্ময়কর! এটা কেমন চিহ্ন?’’ যুবক কৌতূহলভরে হাত বাড়াল, আমার হাতে আঁকা ফুলের মতো চিহ্নটি ছুঁতে চাইছিল।
বৃদ্ধ তখনই তাড়াতাড়ি ওর হাত চেপে ধরলেন, ‘‘ছোও না, এটা আত্মা নিয়ন্ত্রণের জন্য, স্পর্শ করা যাবে না।’’
বৃদ্ধের কথা শুনে যুবকের মুখের রঙ পাল্টে গেল, সে দ্রুত হাত সরিয়ে নিয়ে দু’পা পেছাতে পেছাতে নিজের বুকের ওপর হাত রাখল, এরপর আরও দু’পা পিছিয়ে গেল।
ওর এমন আচরণে আমি বুঝলাম নিশ্চয়ই কোনো গোপন কথা আছে, কিন্তু জিজ্ঞেস করতে সাহস পেলাম না, শুধু মনে রাখলাম, এবং নিরীহ মুখ করে বৃদ্ধকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘‘চাচা,既然你这个 চিহ্ন চিনতে পার, নিশ্চয়ই জানো কীভাবে এটা সরাতে হয়?’’
বৃদ্ধ কোনো উত্তর দিলেন না, কপাল কুঁচকে আমাকে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন, হঠাৎ যেন কিছু মনে পড়ে গেল, মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে উঠল, আঙুল তুলে আমার দিকে ইঙ্গিত করলেন, ‘‘তুই! তাহলে তুই-ই সেই...’’
এ পর্যন্ত বলেই হঠাৎ চুপ করে গেলেন, যেন সময়মতো নিজেকে সামলালেন, আমার তো মাথায় হাত! এতটা বলে থেমে গেলেন কেন? আমি কে? আমাকে নিয়ে কেন সবাই এতো গোপন কথা রাখে?
এরপর বৃদ্ধ লোকটি যুবকের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন, ‘‘দ্রুত তোমার বাবাকে ডেকে আনো, বলো খুব জরুরি, এক মুহূর্ত দেরি করা যাবে না।’’
যুবক মাথা নেড়ে কালো ছায়ার মতো গ্রামে ভেতরে ছুটে গেল। আর বৃদ্ধ লোকটি অধীর চোখে আমাকে দেখতে লাগলেন, আশেপাশের তরুণরাও বোঝাপড়ার ভঙ্গিতে আমাদের ঘিরে ধরল।
আসলে কী হচ্ছে? বৃদ্ধ লোকটি আমাকে চিনে ফেলতেই কেন আরো সতর্ক হয়ে উঠল?
ও আমাকে চিনতে পারল মানে, আমার জন্মদাতারা নিশ্চয়ই এখানকারই কেউ। তাহলে এত বছর পরে একজন হারিয়ে যাওয়া সন্তান বাড়ি ফিরলে, এই শত্রু ভাবটা কেন?
আমি হঠাৎ মনে পড়লাম, গতরাতে সেই মৃত নারীমূর্তিটা গাড়িতে আমাকে বলেছিল, আমার মা শত্রু গোষ্ঠীর মেয়ে, আমি যদি এখানে আসি তবে মেরে ফেলা হবে। তখন মনে হয়েছিল, ওটা আমায় বিভ্রান্ত করার ফাঁদ। এখন মনে হচ্ছে, কথাটা হয়তো সত্যি।
সবাই যেন শত্রুর জন্যই প্রস্তুত, তাহলে কি আমার এখানে আসা ভুল হয়েছিল? আমার পালিত মা এসব জানতেন? তিনি তো ভবিষ্যৎ বলতে পারেন, তাহলে কেন আমায় পাঠালেন?
এভাবে ভাবতে ভাবতেই, কালো পোশাকের যুবক ফিরে এল, দ্রুতবেগে দৌড়াচ্ছে, যেন কোনো মার্শাল আর্ট ছবির যোদ্ধা। ওর পেছনে একজন মোটাসোটা মধ্যবয়সী পুরুষ আসছেন, হাতে কিছু নেই, অবহেলার ভঙ্গিতে এগিয়ে আসছেন, কিন্তু গতি কম নয়, যুবকের ঠিক পেছনেই। খুব দ্রুত আমাদের কাছে পৌঁছে গেলেন।
‘‘বাবা, এই লোকটাই বলছে, ও নিজের বাবা-মাকে খুঁজতে এখানে এসেছে।’’
মধ্যবয়সী লোকটি আমার দিকে তাকালেন, আমিও ওঁর দিকে চাইলাম। আমাদের চোখাচোখি হতেই আমার মস্তিষ্কে যেন বিস্ফোরণ ঘটল, এক অদ্ভুত অনুভূতি হৃদয়ে ঢুকে পড়ল—এ লোকটাই আমার প্রকৃত বাবা।
যদিও ওর মুখ আমার সঙ্গে একটুও মিল নেই, তবু আমার রক্তের ভেতরকার কোনো টান বলছে, এ-ই আমার জন্মদাতা।
লোকটির ঠোঁট নড়ল, কিছু বলতে চাইলেন, কিন্তু পাশে দাঁড়ানো বৃদ্ধ咳ে কাশতে শুরু করলেন। মাঝবয়সী লোকটি আবার কথাটা গিলে ফেললেন, চোখে একবার ভাসিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন, ‘‘চলো আমার সঙ্গে।’’
তারপর তিনি বৃদ্ধের দিকে ফিরলেন, ‘‘হেজেং কাকা, ধন্যবাদ।’’
‘‘এক পরিবারের ভিতর ধন্যবাদ কিসের? তবে, আর ভুল কোরো না, আগের কথা আবার ঘটলে আমরা সামলাতে পারব না...’’ বৃদ্ধ এই পর্যন্ত বলে থেমে গেলেন, মুখে গভীর সংকটের ছায়া।
মধ্যবয়সী লোকটি—যিনি আমার বাবা—মুখে টান পড়ল, ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে বললেন, ‘‘জানি।’’
এই অস্পষ্ট কথাবার্তায় আমার সন্দেহ আরও বেড়ে গেল, কিন্তু এখন এসব ভাবার সময় নয়।
যেহেতু জন্মদাতাকে খুঁজে পেয়েছি, তাহলে হয়তো এই অশুভ চিহ্নটা সরানোর উপায়ও বের হবে, আর আমি বেঁচে যাব!
মধ্যবয়সী লোকটি আমাকে দেখে শহরের ভেতরে হাঁটা ধরলেন, আমি দ্রুত ইউয়ান লিংকে নিয়ে পেছনে চললাম, কালো পোশাকের যুবকও সঙ্গে এল, ‘‘বাবা, তুমি ওকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছ? ও খুব অদ্ভুত, ওর উপস্থিতি আমি পুরোপুরি অনুভব করতে পারি। ওর কারণেই আমি বাইরে বেরিয়েছিলাম।’’
তখনই হঠাৎ বুঝতে পারলাম, এই যুবকই আমার ছোট ভাই। তাই তো ওর সঙ্গে অদ্ভুত টান অনুভব করছিলাম, হয়তো রক্তের টান। যেমন বাবাকে দেখেই চিনে গিয়েছিলাম।
কিন্তু যা ভাবিনি, তাতেই অবাক হলাম—মধ্যবয়সী লোকটি হঠাৎ থেমে ছেলেটিকে বললেন, ‘‘জিলিং, ওর কাছ থেকে দূরে থাকো।’’
তখনই জানলাম, আমার ভাইয়ের নাম জিলিং।
‘‘কেন?’’ জিলিং বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করল।
‘‘তুমি নিজের পরিচয় ভুলে গেছ? আমি তোমায় কী শিখিয়েছি? সব কথা কান দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছ?’’ এবার তিনি কঠোর হয়ে উঠলেন।
জিলিং ভীষণ কষ্ট পেল, বুকের কাছে হাত বুলিয়ে মৃদু স্বরে বলল, ‘‘বুঝেছি।’’
বলেই, সে দ্রুত চলে গেল, চলার ভঙ্গি দেখে বোঝা যায়, অভিমান জমে আছে।
জিলিংয়ের পিছু হটা দেখে আমি আর থাকতে পারলাম না, বহুদিনের প্রশ্নটা করেই ফেললাম, ‘‘জিলিংয়ের কি যমজ ভাই আছে?’’
মধ্যবয়সী লোকটি থমকে একটু ভেবে মাথা নাড়লেন, ‘‘না, ওর মা শুধু ওকেই জন্ম দিয়েছিল।’’
আমার মনটা ধপ করে গেল। কথার অর্থ স্পষ্ট—জিলিংয়ের মা শুধু ওকেই জন্ম দিয়েছিলেন, অর্থাৎ তিনি আমার মা নন।
কিন্তু এ লোক যে আমার প্রকৃত বাবা, তাতে সন্দেহ নেই, জিলিংও তাঁর ছেলে। সুতরাং, আমি আর জিলিং সৎ ভাই—একই বাবা, ভিন্ন মা।
তাহলে আমার মা কি সেই মৃত নারীর মতোই, বাবার পরিবারের হাতে খুন হন?
মধ্যবয়সী লোকটি হয়তো আমার মনের উত্তেজনা টের পেলেন, দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘‘জিচাং, তোমার এখানে আসা উচিত হয়নি।’’
মানুষের অদ্ভুত কাহিনিগুলো যারা ভালোবাসো, তোমাদের অনুরোধ—সংরক্ষণে রাখো। এই গল্পের আপডেট দ্রুতই আসবে।