সপ্তম অধ্যায় অনুসরণ
প্রলয়ের আগমন ঘটেছে, মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যেই সমাজব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়েছে। কিছুক্ষণ আগের মানুষের আচরণই ছিল তার জীবন্ত প্রমাণ—লাল কুয়াশার ভেতরে মানুষ যখন নিয়ন্ত্রণ হারায়, তখন প্রকৃত স্বভাব বেরিয়ে আসে নির্দ্বিধায়। তবে যখন আমার উপর অন্যায় হলো, তখন তাদের ছেড়ে দেওয়া যাবে না, সেটাই স্থির করলাম।
ঠিক তখনই আমার মনে এক টুকরো তথ্য ভেসে উঠল—প্রথম দুর্ভাগার শেষ আশ্রয় এখান থেকে প্রায় একশো ছিয়ানব্বই মিটার দূরে; সে একজন দাস, যার মালিক তাকে বিশেষভাবে আগলে রেখেছিল, কিন্তু শেষমেশ তাকে ‘লাজুক মানুষ’-এর সামনে পাঠিয়ে দেয়। দুইশো তিরাশি মিটার দূরে, সেই দাসের মালিক চিরতরে দেয়ালের পাশে পড়ে আছে—তার চেহারা আমার বেশ পছন্দ হয়েছিল। এবং প্রায় ছয়শো মিটার দূরে, শেষ সৌভাগ্যবানটি শহরের বাইরে যাওয়ার পথে অপেক্ষা করছে—এখন সে রাস্তার পাশে একটি আবর্জনার পাত্রের কাছে কুণ্ডলী পাকিয়ে বসে, শরীর নিস্তেজ।
তথ্যটি স্পষ্ট করে দিল তিনজন কোথায় আছে; যদিও তারা ছড়িয়ে আছে, সৌভাগ্যক্রমে তাদের সবাই শহরের বাইরে যাওয়ার পথেই। সেই পথটি না হলে, আমি সত্যিই এতটা ঝুঁকি নিতাম না। এক গভীর নিঃশ্বাস ফেলে, দ্রুত সবার জন্য পরবর্তী রুট ঠিক করলাম।
পাঁচ মিনিটও পেরোয়নি, আমার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে গেল। কারণ সবার সামনে পড়ে আছে একটি ছিন্নভিন্ন মৃতদেহ, কোমরের কাছে থেকে ছেঁড়া। লিলিয়ান নিঃশব্দে জানাল, ‘‘মালিক, এই লাশটাই ওদের দুইজনের দাস ছিল।’’
দেহের পাশে রক্তমাখা পায়ের ছাপ ও একটি ফল কাটার ছুরি পড়ে রয়েছে। বোঝা গেল, দুর্ভাগ্যজনক ওই তিনজন এই পথেই গিয়েছিল। অনুমান করা যায়, দাসটি পেছনে থেকে বাধা দিয়েছিল, মালিক পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে পালিয়ে গেছে।
লিলিয়ানকে ছুরিটি তুলতে বললাম, আমরা আর থামলাম না। কারণ মাটিতে রক্তের দাগ স্পষ্ট, পায়ের ছাপ এলোমেলো, রক্তে ভেজা। ছাপ দেখে মনে হয় মালিক নিজেও আহত ছিল—প্রতিটি পা ফেলার সঙ্গে রক্ত পড়ছে। রক্ত এখনও ঘন ও তরল, আঙুল ছোঁয়ালে আঠালো লাগে—এটা প্রমাণ করে দাসের মালিকই এই দাগ ফেলে গেছে।
এটা আরও বোঝায়, সে এখান দিয়ে বেশি আগেই যায়নি, এবং সঙ্গীরা তাকে ফেলে গেছে। রক্তের দাগ ঘন থেকে ঘন হয়ে দীর্ঘ হয়ে গেছে, মাটি ভিজে গেছে, চোখে দেখা যায় সে প্রচুর রক্ত হারিয়েছে।
‘‘এত রক্ত যদি এক জনেরই হয়, তবে সে তো এখন কঙ্কাল হওয়ার কথা!’’
আমি যখন ভাবছি লোকটি আদৌ জীবিত না মৃত, তখনই সামনে উত্তরটি পেলাম। দশ মিটারের কম দূরে, এক পুরুষদেহ দেয়ালের পাশে বসে আছে—নিঃস্পন্দ, নিথর। তার মুখ নেই, কারণ মাথাটিই নেই। রক্ত তার গলা থেকে ভেসে মাটিতে ছড়িয়ে পড়েছে, চারপাশে রক্তাক্ত জমি। ধূসর জামা রক্তে লাল, ছেঁড়া ছেঁড়া, দেখে বোঝা যায় পালাবার সময় কতটা অসহায় ছিল।
‘‘শেষমেশ সে লড়াই ছেড়ে দেয়, এখানে বসে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করে—মারা গেছে আরও দশ মিনিটের কিছু আগে।’’
প্রথম ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে দেরি হলো না। যদিও বাতাসে রক্তের গন্ধে বমি আসছিল, মাথা তখনও ঠান্ডা। সাদ হুইলচেয়ার ঠেলে সামনে এল। সে নাক-মুখ ঢেকে, মৃতদেহটি খুঁটিয়ে দেখল। লাশে কোনো প্রতিরোধের চিহ্ন নেই, যেন মুহূর্তেই প্রাণ কেড়ে নেওয়া হয়েছে। শুধু পায়ে গভীর ছুরির ক্ষত, আর গোড়ালির মচকানো ফোলা অংশ বলে দেয়, সে পালাতে পারেনি।
আমার অনুমান, শেষ পর্যন্ত সে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে, তারপর—এক ঝটকায় মাথা ছিঁড়ে ফেলা হয়। গলার ছেঁড়া মাংস দেখে মনে হয়, মাশরুম তুলার মতো তার মাথা ছিঁড়ে নেওয়া হয়েছে। রক্ত এতটাই বেরিয়েছে যে ছিটকে উঠারও সুযোগ পায়নি।
আমি তাকালাম, লাশ থেকে দুই মিটার দূরে বড় এক পায়ের ছাপ। ভাবার কিছু নেই—এটাই ‘লাজুক মানুষ’-এর।
‘‘দাদা, এবার কী করব?’’ মুক চুপচাপ জিজ্ঞাসা করল। সে এই নিরস্ত্র লাশকে চিনতে পেরেছে—এ-ই সেই কুৎসিত ভাষার মধ্যবয়সী লোক। এখন তার লাশ দেখে আগের অপমান মুছে গেছে, বরং ‘লাজুক মানুষ’-এর পায়ের ছাপে গা শিউরে উঠেছে।
আমি মুকের প্রশ্নের উত্তর দিলাম না। কারণ সামনে আমার চোখে ভেসে উঠল—‘সংগ্রহ করো’—এমন একটি বিকল্প।
এই বিকল্পে নানা উপকরণ দেখা গেল—দড়ি, লাইটার, অশুদ্ধির উৎস, খাবার ইত্যাদি। মুকের সঙ্গে হাতবদল করে এগুলো ব্যাগে পুরে নিলাম। এখন ব্যাগে ছয়টি অশুদ্ধির উৎস জমেছে, মানে লাল কুয়াশার ভেতরে আরও আঠারো ঘণ্টা টিকতে পারব।
আমি দেহটার দিকে একবার তাকালাম—‘‘তুমি আগে চলে গেলে, চিন্তা কোরো না, তোমার ভাইও নিচে তোমার সঙ্গে মিলবে।’’
তারপর সবাইকে বললাম, ‘‘এই পথেই এগোতে থাকো।’’
সবাই লাশের পাশ দিয়ে চলে গেল। হুইলচেয়ারে আমি গভীর চিন্তায় ডুবে গেলাম। তথ্য ও পরিস্থিতি মিলিয়ে বুঝলাম—প্রথমে দুই ভাই মিলে একটি বিকৃত দেহের শিকার করেছিল, ছোট ভাই নতুন মিশন শেষ করে ব্যাগ আর দাস পায়, তারপর মিলে মালামাল খোঁজে। ঠিক তখনই মুকের সঙ্গে দেখা, খারাপ উদ্দেশ্য জাগে, নানা ঘটনা ঘটে, বড় ভাই শেষ পর্যন্ত ভাইকে ফেলে পালায়।
এই বড় ভাই স্পষ্টতই বেশি চতুর, মনে পড়ল রেস্তোরাঁয় তার কথাবার্তা কতটা হিসেবি ছিল।
‘‘ওই মা-মেয়েটা… আহ!’’
এমন হৃদয়হীন, ভাইকে ফেলে দেওয়া লোক বেঁচে থাকলে ভবিষ্যতে বিপদ ডেকে আনবেই।
৯৮ ঘণ্টা ২৪ মিনিট ১১ সেকেন্ড… আকাশে সময় গুনছে, আমরা বড় ভাইয়ের আরও কাছাকাছি পৌঁছচ্ছি।
তথ্য আবারও জানাল—পঞ্চাশ মিটার সামনে ডান দিকে, শেষ ভাগ্যবানটি রাস্তার ধারে আবর্জনার পাত্রে কিছুটা শান্তি পেয়েছে। তবে ওকে সামলাতে হলে মুখ বন্ধ রাখতে হবে, কারণ তার মুখ থেকে আসা বিপদ তার নিজের চেয়ে অনেক বেশি।
তথ্য পেয়ে আমি সাদের দিকে তাকালাম।
‘‘সাদ, তোমার সব মোজা খুলে রাখো, একটু পরে কাজে লাগবে।’’
সবাই ঠিক করলাম—আবর্জনার পাত্র থেকে বিশ মিটার দূরে থামব। রাস্তার ধারে একটি সরু গলির মুখ দেখা যায়, অনুমান করা যায় আবর্জনার পাত্রটি সেখানেই।
মুকের মুখে ক্ষতের দাগ দেখে আমি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলাম। ‘‘সাদ, গলির ভেতর আবর্জনার পাত্রে একটা আবর্জনা আছে, আমাদের সেটা পরিষ্কার করতে হবে। তুমি গেলে সঙ্গে সঙ্গে তাকে নিয়ন্ত্রণ করবে, সে প্রতিরোধ করলে প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করবে। লিলিয়ান, সাদের মোজা নিয়ে প্রস্তুত থাকবে, সঙ্গে সঙ্গে তার মুখ বন্ধ করে দেবে!’’